আলেপ্পোর খেলনা পাচারকারী

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব বিভিন্ন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।  অস্ত্র ও গোলাবারুদের প্রভাব মানবজীবনের পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিবেশের উপরও পড়ছে। আর এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। এই বিশ্বে এমন একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠছে যাদের জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন শৈশবে। তাদের মধ্যে অন্যতম শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যহীন শিশু-কিশোররা।

অনেক শিশু যুদ্ধ চলাকালে বাবা-মা, ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজনকে হারিয়ে থাকে। অথচ শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের যত্ন-আত্তি সহানুভূতির ওপর বেড়ে উঠে। যুদ্ধের সময় পিতা-মাতাকে হারিয়ে এসব শিশুরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আগায়। শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা শারীরিক ও মানসিক বিকাশের মধ্যে থাকা অবস্থায় যদি যুদ্ধ বাঁধে তখন তাদের বিকাশ বাঁধাগ্রস্থ হয়। তারা স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

যুদ্ধে কোনো শিশু-কিশোর আক্রমণ বা নির্মম নির্যাতনের শিকার হলে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়াই স্বাভাবিক। কখনো কখনো শিশুরা পঙ্গুত্ব বরণ করে থাকে। অপর্যাপ্ত খাদ্য, সেনিটেশন, দুর্বল জীবনমানের কারণে বিভিন্ন রোগেও  আক্রান্ত হয়ে থাকে শিশুরা।

এমনই পরিবেশে বড় হচ্ছে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ সিরিয়ার শিশুরা। যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে আটকে থাকায় সিরিয়ার শিশুরা তাদের দিনগুলি শৈশবের আলোর উজ্জ্বলতায় কাটাতে পারছে না ।  

রামি আধাম নামের একজন এই সকল  শিশুদের জীবনে কিছু সুখ আনতে চেষ্টা করছেন খেলনা পাচার করছেন সিরিয়ায়!!! 

রামি আধাম
রামি আধাম

 “আলেপ্পোর খেলনা পাচারকারী” হিসেবে পরিচিত রামি আধাম।  আধাম একজন ফিনিশ-সিরিয়ান। তার বয়স ৪৪ বছর এবং ছয় সন্তানের জনক তিনি। ১৯৮৯ সালে সিরিয়া থেকে ফিনল্যান্ডে চলে আসেন। আলেপ্পো ছিল  তার জন্মস্থান।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে, আদহাম সিরিয়ার শিশুদের জীবন উন্নত করার জন্য তুরস্ক থেকে সিরিয়ায় অনেকবার যাওয়া আসা করেছেন।  তিনি গত পাঁচ বছরে ২৮ বার সিরিয়ায় ভ্রমণ করেছেন। প্রতিবারই  তার সাথে দান করা প্রায় ৮০ কেজির বেশি খেলনা নিয়ে এসেছেন এবং সিরিয়ায় পাচার করেছেন।

সিরিয়া ডাইরেক্টের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে আদহাম বলেছিলেন যে সীমান্তে তার সাথে খেলনা আনার পিছনে অনেক বড় অনুপ্রেরণা  হচ্ছে তার মেয়ে ইয়াসমিন।  ২০১২ সালে রামি প্রথম যখন তার প্রচার অভিযানের জন্য  ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ইয়াসমিন প্রায় ৩০ কিলোগ্রাম ওজনের খেলনার একটি ব্যাগ সংগ্রহ করে সিরিয়ার শিশুদের হাতে দেওয়ার জন্য তার বাবাকে দিয়েছিল।  

খেলনা প্যাকেট ভর্তি করছেন রামি আধাম
খেলনা প্যাকেট ভর্তি করছেন রামি আধাম

তার মেয়ের সরল ভালোবাসায় আকৃষ্ট হয়ে, তিনি প্রথম সফরে অতিরিক্ত ১০০টি খেলনা আনার সিদ্ধান্ত নেন এবং তারপর থেকে সীমান্ত দিয়ে এই  খেলনা পাচার অব্যাহত রেখেছেন।

তুরস্কের সীমান্তে এবং সিরিয়ায় খেলনা আনার পাশাপাশি, আধাম তার সাথে ওষুধ, খাবার এবং আরও অনেক কিছু নিয়ে আসেন।   ফিনল্যান্ড সিরিয়া অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে এগুলোর জন্য তিনি টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। সংস্থাটি তিনি ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

আধাম একজন ডুবোজাহাজ  প্রকৌশলী ছিলেন।কিন্তু যখন সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি তার সমস্ত মনোযোগ  সিরিয়ার জন্য তার দাতব্য প্রতিষ্ঠানে মনোনিবেশ করেন। দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি সিরিয়ান এবং ফিনিশ স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে গঠিত।

তিনি তার প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থাটিতে একা কাজ করে কুলোতে পারছিলেন না। অথচ অনেক অর্থ সাহায্য পাচ্ছিলেন তিনি। তখন  তাকে সাহায্য করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের একটি নিবেদিত প্রাণ দল নিয়োগ করেছেন। এর মাধ্যমে তার জন্য অনেক কাজই সহজ হয়ে পরেছিল। 

শিশুদের মাঝে খেলনা বিতরণ করছেন রামি আধাম
শিশুদের মাঝে খেলনা বিতরণ করছেন রামি আধাম

কিন্তু সংস্থাটির মধ্যে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যে সিরিয়ায় প্রবেশ করতে সক্ষম।  দুঃস্থদের সাহায্য করার জন্য এই কাজটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশটি।  কারণ এতে নিজের জীবনের কোন নিশ্চয়তা ছিল না। তাই এই কাজটি তিনি নিজে করছিলেন। 

তিনি সিরিয়া ডাইরেক্টকে  আরো বলেছেন যে, তুরস্ক সিরিয়ায় তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে কাজটি আরও কঠিন হয়ে পড়েছিল।  শরণার্থীরা যে পথ ব্যবহার করছে, তাকেও  এখন একই পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।  একবার, দুইবার নয়; তিনি ১২ বার এই কাজটি করেছেন।

এটা মনে হতে পারে যে তিনি মানবতার জন্য তার জীবনকে বহুবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ফেলে  উদারতার চূড়ান্ত কাজ করছেন। কিন্তু আধামের ইচ্ছা আসলে এর থেকেও বড় কিছু। তার প্রচারণার পাশাপাশি আরও বড় একটি চিন্তা তিনি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

২০১৬ সালের আগস্টে, তিনি তুর্কি সীমান্তের কাছে এবং রাশিয়ান ও সিরিয়ার বিমান হামলা এবং বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে দূরে সিরিয়ায় স্কুল নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। স্কুলটি নির্মানের জন্য দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের জন্য একটি GoFundMe নামে একটি ওয়েবসাইটে তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছিলেন।

রামি আধাম
রামি আধাম

তার GoFundMe ওয়েবসাইটটি  সেট আপ করার মাত্র এক মাসের মধ্যে  আধাম প্রায় ৭০০০০ ডলার সংগ্রহ করেছেন। সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আলেপ্পোতে  তিনি একটি শরণার্থী শিবিরে একটি নতুন উচ্চ বিদ্যালয় নির্মাণের কাঠামো শুরু করেছিলেন।

ইউনিসেফের ডেপুটি এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জাস্টিন ফোরসিথ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে “আলেপ্পোর শিশুরা একটি জীবন্ত দুঃস্বপ্নের মধ্যে আটকা পড়েছে  এবং তারা ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে”। তবুও আধামের এই কাজ অন্ধকারের মধ্যে একটি আলো মতন  সিরিয়ার শিশুদের  কাছে।

You may also like...

Leave a Reply