কথিত “জাদুকর” বাচ্চাদের আশ্রয়স্থল ল্যান্ড অফ হোপ

পৃথিবীতে একমাত্র দুজন মানুষ  যারা সবচেয়ে বেশি আমাদের ভালোবাসেন, তারা হচ্ছেন আমাদের বাবা-মা। সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে পেটে ধারণ করেন। অনাগত সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর স্বপ্নে বিভোর প্রতিটি মা-ই জানেন যে, জন্মদানের মুহূর্তে তার নিজের জীবন প্রদীপটুকু নিভে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। বাবাও জানেন যে হয়তোবা তিনি তার প্রিয় সহধর্মিণীকে হারাতে পারেন। তবুও  তাদের স্বপ্ন দেখা থেমে থাকে না। 

সন্তানের মুখখানা দেখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মাঝেও যেন সুখ। শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার থেকে এই পৃথিবীতে অসহায় কেউ থাকে না। কেননা তখন সে অনেক ছোট থাকে, হাঁটতে পারে না, চলতে পারে না, কথা বলতে পারে না। সেই সময় তার পাশে বাবা-মাই ঢাল হয়ে  দাঁড়ায়। কোলে নিয়ে তিল তিল করে নিজেদের রক্ত পানি করে নিজেদের পেটে ক্ষুধা পুষে রেখে সন্তানের ক্ষুধা মেটান।

কিন্তু পৃথিবীতে এমনও বাবা মা রয়েছে যারা তাদের সন্তানকে দূরে ঠেলে দেয়। তাদেরকে মৃত্যুর মুখোমুখি ফেলে দেয়। ঠিক এমনই ঘটনা অহরহ ঘটছে নাইজেরিয়াতে। জাদুকর ভেবে সন্তানদেরকে ফেলে দিচ্ছে অনেক বাবা-মা।

এসব  শিশুদেরকেই বাঁচার জন্য সাহায্য করে চলছেন আনজা রিংগ্রেন লোভেন। তিনি হলেন ল্যান্ড অফ হোপের প্রতিষ্ঠাতা। এটি এমন  একটি সংস্থা  যা নাইজেরিয়ায় প্রতি বছর জাদুবিদ্যার দায়ে অভিযুক্ত হাজার হাজার শিশুকে বাঁচানোর লড়াইয়ে সাহায্য করছে৷  

 আঞ্জা রিংগ্রেন লোভেন
আঞ্জা রিংগ্রেন লোভেন

তার পুরো নাম আঞ্জা রিংগ্রেন লোভেন। ডেনমার্কের ফ্রেডরিকশাভনে ১৯৭৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি।  আঞ্জা তার মা এবং দুই বোনের সাথে একটি ছোট বাড়িতে বেড়ে উঠেছেন । কিন্তু আঞ্জাও ভাগ্যক্রমে  কষ্টের সাথে অপরিচিত নন। 

তার মা মারা যান যখন তিনি ছোট ছিলেন এবং তার বাবা প্রতিনিয়ত মদ পান করতেন।  তার মায়ের মৃত্যুর পর, আঞ্জা  উদ্বেগ এবং বিষণ্নতায় পঙ্গু হয়ে পড়েন। তার শৈশবের পৃথিবী দেখার স্বপ্ন – বিশেষ করে আফ্রিকা – তখনও অনেক দূরে ছিল।  

২০০৮ সালে, তিনি একটি ব্রিটিশ ডকুমেন্টারি দেখেছিলেন যেখানে  বাচ্চাদের জাদুবিদ্যার অভিযোগে নির্যাতন করা হচ্ছে। পরে তাদেরকে হত্যা করে কবর দেওয়া হয়। ছবিটি আঞ্জার মধ্যে আগুনের মতো কাজ করে। এছাড়াও এটি বিশ্ব কুসংস্কারে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের প্রতি তার ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই কাজের প্রতি তার ক্ষোভ প্রকাশ করে, তিনি তানজানিয়া এবং মালাউইতে একজন সাহায্য কর্মী হিসেবে কাজে যোগদান করেন।  

২০১২ সালে তিনি তার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন।  তার সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে Land of Hope চালু করেন। এর লক্ষ্য ছিল যাদেরকে জাদুবিদ্যার অভিযোগে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

নাইজেরিয়াতে আঞ্জা তার সহকর্মীর মধ্যে তার জীবনের ভালবাসা খুঁজে পেয়েছেন।তিনি হচ্ছেন ডেভিড এমানুয়েল উমেম। তিনি আইনের ছাত্র । কিছুদিন পরে, তারা দুইজন Land of hope  এর নাইজেরিয়ান শাখা, আফ্রিকান চিলড্রেন’স এইড, এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন  খোলেন । 

২০১৬  সালে একটি অপুষ্ট নাইজেরিয়ান "জাদুকর" শিশুকে পানি খাওয়াচ্ছে আঞ্জা
২০১৬  সালে একটি অপুষ্ট নাইজেরিয়ান “জাদুকর” শিশুকে পানি খাওয়াচ্ছে আঞ্জা

২০১৬  সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অপুষ্ট নাইজেরিয়ান ” জাদুকর  ” শিশুর সাথে তার একটি ছবি যখন ভাইরাল হয়েছিল তখন তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠেন ৷ 

এক পাষণ্ড বাবা মা তাদের দুই বছরের শিশুকে জাদুকর ভেবে রাস্তায় ফেলে দেয়। জানা যায়, প্রায় আটমাস আগে বাচ্চাটির “জাদুকরি শক্তি” আছে ভেবে তার বাবা মা ঘরে থেকে বের করে দেয়। 

পথচারীদের ফেলে যাওয়া খাবার খেয়েই সে এতদিন কোনরকমে বেঁচে ছিল। ব্যাপারটি পরে নজরে আসে ল্যান্ড অফ হোপের প্রতিষ্ঠাতা আঞ্জা এর নজরে।  ছবি অনুযায়ী  দেখা যাচ্ছিল আঞ্জাকে বাচ্চাটিকে  কিছু বিস্কুট এবং পানি খেতে দেয়। বাচ্চাটিও ভীষণ সাবধানতার সাথে পানি খাচ্ছিল৷ এরপর বাচ্চাটিকে  কম্বলে মুড়িয়ে কোলে তুলে নিয়ে হাসপাতালে যান । আঞ্জা ভাবেনি যে সে বাঁচবে।   

২০১৬  সালে অপুষ্ট নাইজেরিয়ান "জাদুকর" শিশু হোপকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে আঞ্জা
২০১৬  সালে অপুষ্ট নাইজেরিয়ান “জাদুকর” শিশু হোপকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে আঞ্জা

“বাচ্চাটিকে নিয়ে যখন আমরা গাড়িতে উঠলাম তখন আমি আমার স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম যে আমাদের তার একটি নাম রাখা উচিত। আমি ওর নাম হোপ (আশা) রাখতে চাচ্ছি” তিনি বলছিলেন । “ আমি চাইনি সে নামহীন অবস্থায়ই মারা যাক। আমি চেয়েছিলাম সে  যদি মারা যায় তাহলে যেন মর্যাদার সাথে মারা যায়।” 

জাদুকর শিশু হোপের সাথে আঞ্জা
জাদুকর শিশু হোপের সাথে আঞ্জা

হোপ বেঁচে গিয়েছিল এবং এখন ল্যান্ড অফ হোপে ৮০ জন অন্যান্য সুন্দর বাচ্চাদের সাথে বসবাস করছে। এরা সকলেই তথাকথিত “ডাইনী শিশু” বলে পরিচিত যাদেরকে জাদুবিদ্যার ভয়ে পরিত্যক্ত হতে  হয়েছে। এদেরকে নিয়েই গড়ে উঠেছে ল্যান্ড অফ হোপের ঘরগুলো।

 শিশুদের এই সেবা কেন্দ্রটি নাইজেরিয়ার  দক্ষিণ-পূর্ব অংশে  তিন একর জমিতে অবস্থিত। আঞ্জা এবং তার স্বামী ডেভিড দ্বারা পরিচালিত হয়। এখানে শিশুরা ভালবাসা, যত্ন, রুম, বোর্ড এবং শিক্ষা পায়। এটি একটি বাড়ির মতো পরিবেশ যা শিশুদের জন্য একটি খুব বড় পরিবারে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা দিয়ে থাকে।

জাদুকর শিশু হোপের সাথে আঞ্জা
জাদুকর শিশু হোপের সাথে আঞ্জা

আঞ্জা জানেন যে  দক্ষিণ – পূর্ব নাইজেরিয়াকে কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে পারলে অনেক বাচ্চাকে সাহায্য করা হবে। যাদের অনেকেরই  পিতামাতা তাদেরকে রাস্তায় ফেলে দিয়েছে । এক নাইজেরিয়াতেই হাজার হাজার পথশিশু আছে যাদেরকে স্থানীয় পুরোহিত, ডাইনী ডাক্তার, প্রতিবেশী বা আত্মীয়রা জাদুকর  বলে ভাবে ।  

আঞ্জা বলেন যে শিক্ষার অভাব এবং চরম দারিদ্র্যতার কারণে নাইজেরিয়াতে একটি ব্যাপক খারাপ  সাংস্কৃতিক বিশ্বাস তৈরি করেছে যে শিশুরা জাদুকর  হতে পারে। তারা এও ভাবে যে এসব শিশু যে পরিবার এবং গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছে তাদেরকে  অভিশাপ দিবে।  

“আমাদের এই সকল গ্রামবাসীদের তাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে এবং আলোচনা প্রোগ্রামের মাধ্যমে তাদেরকে সঠিক বিশ্বাসে আলোকিত করতে সাহায্য করতে হবে,”৷ “অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হল শিক্ষা।”  এসব কথা আঞ্জাই বলেছেন। 

২০১২ সাল থেকে, আঞ্জা এবং ডেভিড বেঁচে থাকা জাদুকরী শিশুদের শনাক্ত করতে এবং তাদের নিরাপদে নিয়ে আসার জন্য ওই অঞ্চলে একটি স্থানীয় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। ল্যান্ড অফ হোপ অ্যাডভোকেসি ড্রাইভ এবং হোম ভিজিটের মাধ্যমে  স্থানীয় সম্প্রদায়কে জাদুবিদ্যা সম্পর্কিত মিথ্যা তথ্য সম্পর্কে অবগত  করার জন্যও কাজ করে চলেছেন। 

You may also like...

Leave a Reply