কেন বলির শিকার জর্জ স্টিনি জুনিয়র?

১৯৪২ সাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন প্রায় শেষের দিকে। আমেরিকার দক্ষিণ ক্যারোলিনার একটা ছোট্ট শহরের ঘটনা। শহরটা গড়ে উঠেছিল কিছু কাঠ চেড়াই কারখানা অর্থাৎ স’মিলকে কেন্দ্র করে। শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ দুই শ্রেণির লোকেরই বসবাস ছিল ওখানে। তবে শ্বেতাঙ্গরা ছিল বেশিরভাগই ধনী, তারা থাকত শহরের একপাশে। আর শহরের মাঝখান দিয়ে যে রেললাইন গেছে, তার অন্যপাশে ছিল কৃষ্ণাঙ্গদের বসবাসের এলাকা। কৃষ্ণাঙ্গরা বেশিরভাগই ছিল শ্রমিক শ্রেণির গরিব মানুষ।

সময়টা ছিল বসন্তের শুরু, ২৩ মার্চ। ছোট্ট শহরটাতে হঠাৎ একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আগের দিন অর্থাৎ ২২ মার্চ, বেটি বিনিকার আর ম্যারি এমা নামে দুটি শ্বেতাঙ্গ মেয়ে বুনো ফুল কুড়াতে বের হয় নিজেদের সাইকেলে চড়ে। 

বেটি বিনিকার আর ম্যারি এমা
বেটি বিনিকার আর ম্যারি এমা

ওই দিন তারা আর বাসায় ফেরেনি। পর দিন সকালে শিকারী কুকুরসহ একটা তল্লাশীদল বের হয় তাদের খোঁজে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে কৃষ্ণাঙ্গদের এলাকায় একটা পানি নিষ্কাশনের নালায় দু’জনেরই লাশ পাওয়া যায় একসাথে।

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে দেখা যায়, ভারী ও ভোঁতা কোনো ধাতব বস্তু দিয়ে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে দু’জনের। ধারণা করা হয়, রেললাইনের স্পাইক দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে তাদেরকে। মৃত্যুর সময় বিনিকারের বয়স ছিল ১১ বছর, আর ম্যারির বয়স মাত্র ৮ বছর।

একই এলাকার বাসিন্দা হলেও তখন ওই শহরে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে মোটেও সুসম্পর্ক ছিল না। এদের সবকিছু ছিল আলাদা; এমনকি বাচ্চাদের স্কুল আর উপাসনার চার্চও ছিল আলাদা।

এই ঘটনায় শ্বেতাঙ্গদের বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সহজেই অনুমেয়, হলোও তাই। আর লাশ দুটি যেহেতু কৃষ্ণাঙ্গদের এলাকায় পাওয়া গেছে, সুতরাং তারাই ছিল একমাত্র সন্দেহভাজন। লাশ দুটি যে নালায় পাওয়া গেছে তার অদূরেই থাকত জর্জ স্টিনি নামের এক কৃষ্ণাঙ্গের পরিবার। 

জর্জ স্টিনি একটা স’মিলে কাজ করতেন, আর ওই মিলেরই মালিকানাধীন জায়গাটিতে তিনি তার স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে বসবাস করতেন। ঘটনার পরপরই পুলিশ জর্জ স্টিনির দুই ছেলে জর্জ স্টিনি জুনিয়র আর জনকে ধরে নিয়ে যায়। জর্জ স্টিনি আর তার স্ত্রী তখন বাসায় ছিলেন না। পরে পুলিশ জনকে ছেড়ে দেয়, কিন্তু স্টিনি জুনিয়রকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য আটকে রাখে।

স্টিনি
স্টিনি

জর্জ স্টিনির বিচারপ্রক্রিয়া ছিল ন্যায়বিচারের ইতিহাসে একটা কালো অধ্যায়। মাত্র এক দিনের মধ্যে বিচারের জন্য জুরি গঠন করা হয়। জর্জকে পুলিশ আটক করার পরই জর্জের বাবাকে চাকরি থেকে আর তার পুরো পরিবারকে শহর থেকে বিতাড়িত করা হয়। জর্জের গরিব মা-বাবা তার পক্ষে কোনো আইনজীবী নিযুক্ত করতে পারেননি। আদালত একজন ট্যাক্স কমিশনারকে জর্জের এটর্নি নিযুক্ত করে।

জর্জের বিপক্ষে তিনজন পুলিশ অফিসার স্বাক্ষ্য প্রদান করে। এছাড়াও প্রসিকিউটর আরো তিনজনের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করে। এদের একজন হলেন রেভারেন্ড ফ্রান্সিস, যিনি লাশ দুটি নালা থেকে উদ্ধার করেন; বাকি দুজন হলেন লাশ দুটির পোস্টমর্টেম করা ডাক্তারদ্বয়। এছাড়াও প্রসিকিউটর, তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের কাছে জর্জ বালিকা দুটিকে খুনের ব্যাপারে স্বীকারোক্তি দিয়েছে বলে দাবি করেন। 

সেখানে দাবি করা হয় যে জর্জ বেটি বিনিকারকে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে দু’জনকে হত্যা করে এবং হত্যাকাণ্ডের পরে বেটি বিনিকারকে ধর্ষণ করে বলে স্বীকার করেছে। কিন্তু পোস্টমর্টেমকারী দুজন ডাক্তারের স্বাক্ষ্য ও রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল (দুজনেরই হাইমেন ইনট্যাক্ট ছিল)। তথাপি জুরিরা জর্জকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং আদালত ১৪ বছর বয়সী কিশোর জর্জকে মৃত্যদণ্ড প্রদান করে।

পুরো বিচারকাজ শেষ হতে সময় লাগে মাত্র দুই ঘণ্টা দশ মিনিট। এই পুরো সময়টাতে জর্জের এটর্নি একবারের জন্যও কাউকে জেরা করেননি, প্রসিকিউশনের দাবি করা জর্জের স্বীকারোক্তি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি, এমনকি কোর্ট মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর রায়ের বিরুদ্ধেও আপিল না করার সিদ্ধান্ত নেন। বলা বাহূল্য যে বিচারক, জুরি, এটর্নিসহ আদালতে উপস্থিত সকলেই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ।

জর্জের মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন সন্ধ্যায়। ১৪ বছর বয়সী কিশোর জর্জকে যখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য ইলেকট্রিক চেয়ারে বসানো হয় তখন দেখা যায় তার শীর্ণকায় দেহ চেয়ারের তুলনায় অনেক ছোট। চেয়ারের ওপর কয়েকটা বই রেখে তার ওপর জর্জকে বসানো হয়। হাত, পা চেয়ারের সাথে বেঁধে সবশেষে মুখোশ পরানোর সময় আতঙ্কিত জর্জ ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে। মুখোশটাও ছিল তার মুখের তুলনায় খানিকটা বড়।

স্টিনি
স্টিনি

আড়াই হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ চার মিনিট ধরে চালানো হয় জর্জের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য। এত উচ্চ ভোল্টেজ সহ্য করতে পারেনি জর্জের কোমল দেহ। বাঁ চোখটা গলে গিয়েছিল তার। পরিবারের পক্ষে একমাত্র জর্জের বাবাই ওই দিন উপস্থিত ছিলেন ছেলের লাশ গ্রহণের জন্য। যে তল্লাশীদলটি বেটি বিনিকার আর ম্যারি এমার লাশ খুঁজে বের করেছিল, জর্জের বাবা স্টিনি সিনিয়র নিজেও ওই দলে ছিলেন। সেদিন কি তিনি ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবতে পেরেছিলেন, ভাগ্য কী নিষ্ঠুরতম খেলা খেলতে চলেছে তার সাথে! লুসিয়ানার ক্রাইলিতে কোনো এক অজ্ঞাত সমাধিতে জর্জকে সমাহিত করা হয়।

জর্জ স্টিনির করুণ পরিণতি তার মৃত্যুর বহু দিন পরও বিস্মৃত হয়নি। রাষ্ট্র ও সমাজপতিদের নির্মমতার শিকার হয়ে অকালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া দরিদ্র এই কিশোরের ঘটনা সমাজের প্রতিটি বিবেকবান মানুষকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফিরেছে যুগের পর যুগ। অবশেষে জর্জের মৃত্যুর ৭০ বছর পর ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর সাউথ ক্যারোলিনার আদালত জর্জের বিচারপ্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং মৃত্যদণ্ড সঠিক ছিল না বলে ঘোষণা করেছে।

বেশ কিছু উপন্যাস, টিভি নাটক, মুভি নির্মিত হয় এই ঘটনা নিয়ে অথবা এর ছায়া অবলম্বনে।

ডেভিড স্টাউট এই ঘটনার উপর ভিত্তি করে ১৯৮৮ সালে রচনা করেন তার প্রথম উপন্যাস ‘ক্যারোলিনা স্কেলেটন’ যেটি পরে এডগার এলান পো পুরস্কারে ভূষিত হয়।

আলবার্ট ফ্রেঞ্চ ১৯৯৩ সালে ‘Billy’ নামে উপন্যাস লিখেন এই ঘটনা নিয়ে।

এছাড়া আমেরিকান লেখিকা ও অভিনেত্রী ক্যারেন পারসন ‘How High The Moon’ নামে একটি উপন্যাস লিখেন জর্জ স্টিনির ট্রাজেডি নিয়ে।

স্টিফেন কিং এই ঘটনার ছায়া অবলম্বনে একটি উপন্যাস লিখেন যা থেকে পরে হলিউডে ‘গ্রিন মাইল’ নামে জনপ্রিয় একটি সিনেমা তৈরি হয়।

You may also like...

Leave a Reply