হিফযুল কুরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশী

ইসলামি সভ্যতা বিকাশে বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য। এ দেশের ইসলামি সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাস অনেক প্রাচীন, রয়েছে আলাদা ঐতিহ্যও। সেই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন ও কেরাত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বাংলাদেশের শিশু-কিশোর হাফেজ ও কারিরা। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জনের পাশাপাশি সুমধুর কোরআন তেলাওয়াত ও হৃদয়কাড়া সুর দিয়ে নজর কেড়েছে বিশ্ববাসীর। তাদের অনন্য অবদানে প্রায়ই বিশ্বমিডিয়ায় শিরোনাম হচ্ছে বাংলাদেশ।

 আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় দেশের নাম উজ্জ্বল করলেন হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম। ১১১ দেশের ১৫৩ হাফেজের মধ্যকার এ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন তিনি।

হাফেজ তাকরিম
হাফেজ তাকরিম

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায়  ‘৪২তম বাদশাহ আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতা’ অনুষ্ঠিত হয়। 

করোনাকাল পেরিয়ে মসজিদে হারাম ধীরে ধীরে ফিরছে পুরনো রূপে। বুধবার রাতে দেশ-বিদেশের ওমরাহ পালনকারীদের ভিড়ের মধ্যে মক্কায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের ছোট ছোট কয়েকটি জটলা মসজিদে হারামের প্রবেশপথে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন একটি সুসংবাদের। অবশেষে মিলল সেই ঈর্ষা জাগানিয়া সংবাদ। 

মক্কার পবিত্র মাটিতে, মসজিদে হারামের এক্সটেনশন অংশে তখন ভেসে উঠছে লাল-সবুজের পতাকা। মঞ্চে গর্বভরে হেঁটে যাচ্ছে মাত্র ১৩ বছর বয়সী এক বাংলাদেশি খুদে হাফেজ। তার বদৌলতে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি হাফেজদের অর্জনের খাতায় যুক্ত হলো আরেকটি গৌরব ও গর্বের রঙিন পালক। কণ্ঠের জাদুকরী মাধুর্য আর সুরের ডানায় ভর করে, নিজের সবটুকু শ্রম দিয়ে ছিনিয়ে এনেছে কিশোর হাফেজ তাকরিম বিজয়ের বরমাল্য। 

সৌদি আরবে হাফেজ তাকরিম
সৌদি আরবে হাফেজ তাকরিম

সৌদি আরবের স্থানীয় সময় বুধবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাতে মক্কার হারাম শরিফে জমকালো বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে একে একে কোরআন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম। 

পুরস্কার হিসেবে সে পায় এক লাখ রিয়াল (প্রায় সাড়ে ২৭ লাখ টাকা) ও সম্মাননা ক্রেস্ট। পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তার উপদেষ্টা ও মক্কা নগরীর গভর্নর খালেদ আল ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ এবং দেশটির ইসলাম ও দাওয়াহ বিষয়ক মন্ত্রী ড. আবদুল লতিফ বিন আবদুল আজিজ আলে শেখসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ।

সৌদি আরবে পুরস্কার হাতে বিজয়ী তাকরিম
সৌদি আরবে পুরস্কার হাতে বিজয়ী তাকরিম

কুরআন হিফজের বড় এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১১১ দেশের ১৫৩ জন হাফেজ অংশ নেয়। তাদের মধ্যে তাকরিম এই গৌরব অর্জন করল।

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, তাফসির ও গবেষণার প্রতি মানুষের আগ্রহ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতি বছর সৌদি সরকার এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে গত দুই বছর তা স্থগিত ছিল। এবার বাদশাহ সালমানের ব্যক্তিগত আগ্রহে প্রতিযোগিতায় পুরস্কারের অঙ্ক দ্বিগুণ করা হয়েছে। 

সেই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। মক্কায় অনুষ্ঠিত এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা পাঁচটি গ্রুপে অনুষ্ঠিত হয়। তন্মধ্যে হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম ১৫ পারা গ্রুপে (চতুর্থ গ্রুপ) অংশ নেয়। এই গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেছে লিবিয়ার যিয়াদ মোহাম্মদ খলিল হাবিশ। পুরস্কার হিসেবে সে পেয়েছে এক লাখ ২০ হাজার সৌদি রিয়াল। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে কেনিয়ার আবদুর রহমান মুসা আব্দুল্লাহ। সে পেয়েছে এক লাখ ১০ হাজার সৌদি রিয়াল।

চলতি বছরের জুন মাসে লিবিয়ার হায়ার অথরিটি ফর এনডাওমেন্টস অ্যান্ড ইসলামিক অ্যাফেয়ার্সের তত্ত্বাবধানে রাজধানী বেনগাজিতে ৪০টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত দশম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার অংশ নিয়ে সপ্তম স্থান অধিকার করে হাফেজ তাকরিম। এছাড়া প্রতিযোগিতায় সর্বকনিষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে তাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয়।

গত ৫ মার্চ ইরানের রাজধানী তেহরানের আন্দিশাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ৩৮তম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। ওই প্রতিযোগিতায় ২৯টি দেশ থেকে নির্বাচিত ৬২ জন প্রতিযোগী ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে। ছয় দিনের এ প্রতিযোগিতায় ১০ বিভাগে ৩০ জনকে চূড়ান্ত বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই প্রতিযোগিতায় স্কুল পর্যায়ের ছেলে শিক্ষার্থীদের পুরো কোরআন হিফজ বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করে হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম।

২০২১ সালের আগস্ট মাসে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় তাকরিম।

২০২০ সালে পবিত্র রমজান মাসে বাংলাভিশন টেলিভিশন আয়োজিত হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয় সালেহ।

হাফেজ সালেহ আহমাদ তাকরিম টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ভাদ্রা গ্রামের হাফেজ আব্দুর রহমানের ছেলে। সে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামি মাদরাসার কিতাব বিভাগের শিক্ষার্থী। 

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মুরতাজা হাসান ফয়েজী মাসুম হাফেজ তাকরিমের পড়াশোনা ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতা করেন উদারভাবে। হাফেজ তাকরিমের এ অনন্য কৃতিত্বে মুফতি মুরতাজা হাসান ফয়েজী মাসুম আল্লাহতায়ালার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানানোর পাশাপাশি দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন।

এই প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী ইতিপূর্বে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু কুয়েত, মিসর ও আলজেরিয়ার আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার জন্য বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হলেও করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। তবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তারা অংশ নিয়ে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে।

পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতার বৃহৎ এ আসরে অংশ নিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ফয়জুল কোরআনের প্রধান শিক্ষক হাফেজ কারি মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিমকে নিয়ে সৌদি এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে জেদ্দার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। এর আগে গত মে মাসে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে আয়োজিত বাছাই প্রতিযোগিতায় ‘খ’ গ্রুপ থেকে একমাত্র প্রতিযোগী হিসেবে সালেহ আহমদ তাকরিম নির্বাচিত হয়।

দেশের বরেণ্য হাফেজদের জাতীয় পদক ও পুরস্কারে ভূষিত করলে জাতির গর্ব ও সম্মান বৃদ্ধি পাবে। যারা দেশকে এমন ঈর্ষণীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়, তাদের জাতীয় স্বীকৃতি সময়ের দাবি। জাতীয় স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেলে আরও অনেকেই কোরআন প্রতিযোগিতায় উদ্বুদ্ধ হবে। চর্চা বাড়বে কোরআন মাজিদের।

আমরা জানি, সব ধরনের রেকর্ড, সাফল্য, অর্জন যেকোনো দেশের জন্য সুখকর। বছরের পর বছর বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় সফলতা বাংলাদেশের জন্য বিরল অর্জন বটে। এই অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন বিশ্বব্যাপী সম্মানিত হচ্ছে, তেমনি স্থান করে নিয়েছে বিশ্ব রেকর্ড বুকে। অর্জিত হচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। আমার চাই বাংলাদেশি হাফেজদের এমন সফলতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক। আরও বেশি বেশি সম্মান বয়ে আনুক। উজ্জ্বল করুক দেশের নাম।

You may also like...

Leave a Reply